তুলা আমদানির ওপর আরোপিত ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বস্ত্রকলের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। একই সঙ্গে দেশী টেক্সটাইল মিলে উৎপাদিত তুলার সুতা, কৃত্রিম আঁশ এবং অন্যান্য আঁশের সংমিশ্রণে তৈরি সুতার ওপর উৎপাদন পর্যায়ে কেজিপ্রতি সুনির্দিষ্ট কর ৫ টাকা অব্যাহতি প্রদানেরও দাবি জানানো হয়েছে। শনিবার (৫ জুলাই) গুলশান ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।
এ সময় ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, অগ্রিম আয়কর আরোপ সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের জন্য সুবিধাজনক মনে হলেও সিদ্ধান্তটি আত্মঘাতী। এতে বস্ত্র খাত বড় ধরনের সংকটে পড়বে। চলতি মূলধন সংকুচিত হতে হতে একপর্যায়ে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা বস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত সুতা উৎপাদন, সুতা ডাইয়িং, ফিনিশিং, কোনিং, কাপড় তৈরি, কাপড় ডাইয়িং, প্রিন্টিং অথবা এমন এক বা একাধিক প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত মিল বা কোম্পানির শিল্পের ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়ের ওপর প্রদেয় আয়করের হার একই শিল্প খাত হিসেবে আরএমজি সেক্টরের সমপরিমাণ (১২ শতাংশ) ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করার দাবি জানান।
লিখিত বক্তব্যে বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, দেশের বস্ত্র খাত দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক সুদের হার ১৫-১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, রফতানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনা হ্রাস এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সংকট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বস্ত্রশিল্পের এসব সমস্যা ছাড়াও তুলা আমদানিতে ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ, দেশীয় টেক্সটাইল মিলে উৎপাদিত কটন সুতা ও কৃত্রিম আঁশ ও অন্যান্য আঁশের সংমিশ্রণে তৈরি সুতার ওপর উৎপাদন পর্যায়ে কেজিপ্রতি সুনির্দিষ্ট কর ৫ টাকা আরোপ দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পে নতুন চ্যালেঞ্জে যোগ করেছে। যার ফলে উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিটিএমএর সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৮৫৮। এর মধ্যে স্পিনিং, উইভিং এবং ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বেসরকারি খাতে একক বিনিয়োগ হিসেবে সর্বাধিক। দেশের রফতানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসছে টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল খাত থেকে। যার প্রায় ৭০ শতাংশের জোগানদাতা বিটিএমএর নেতৃত্বাধীন টেক্সটাইল খাত। তৈরি পোশাকসহ টেক্সটাইল এবং অ্যাপারেল খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৫ বিলিয়ন ডলার এবং সরকারের যথাযথ সহযোগিতা পেলে রফতানি আয় ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার করা সম্ভব।
শওকত আজিজ জানান, বর্তমান সময়ে শিল্প কারখানায় তীব্র জ্বালানি সংকট, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ ক্ষেত্র বিশেষে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে দেশীয় টেক্সটাইল মিল বিশেষ করে স্পিনিং সেক্টর মারাত্মক সংকটে পড়েছে। এছাড়া দেশে তুলা উৎপাদন না হওয়ায় বিদেশ থেকে তুলা আমদানি করে সুতা উৎপাদন করতে হয়। যা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হলেও দেশীয় মিলগুলো সুতা উৎপাদন করে নীট গার্মেন্টে ১০০ শতাংশ এবং ওভেন গার্মেন্টে ৫৫-৬০ শতাংশ সুতা সরবরাহ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। দেশের জনসংখ্যার চাহিদার বিপরীতে প্রায় সম্পূর্ণ পোশাক দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। এতে প্রতিবছর ১২-১৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই তুলা আমদানিতে ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ করেছে। অথচ অতীতে কখনোই তুলা আমদানিতে কোনো ধরনের শুল্ক ছিল না। আপাতদৃষ্টিতে এ সিদ্ধান্ত সরকারের রাজস্ব সংগ্রহে সুবিধাজনক মনে হলেও এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর ফলে দেশের টেক্সটাইল খাত মারাত্মক সংকটে পড়বে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা আমাদের সক্ষমতাকে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পিছিয়ে দেবে। ফলে দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলো ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবে না। প্রত্যেকবার তুলা খালাসের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ অগ্রিম আয় কর দিলে বছর শেষে সেটি ২৯ শতাংশে দাঁড়াবে। এতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হবে।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সহ-সভাপতি সালেউদ জামান খান, পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন, ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার, খোরশেদ আলম, হোসেন মেহমুদ, সাবেক পরিচালক মো. বাদশাহ মিয়া, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি অমল পোদ্দার বক্তব্য দেন।